ভোলার ভূয়া ডাক্তারের ছড়াছড়ি, ড্রাগ লাইন্সেস ছাড়া ঔষধ বিক্রয়

0
404

আকতারুল ইসলাম আকাশ:- প্রতিদিন টেলিভিশনের পর্দায়, খবরের কাগজে, ফেসবুকে ও ইন্টারনেটে দেখা যায় ভূয়া ডাক্তারদের নিয়ে অনেক সংবাদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এইসব ভূয়া ডাক্তারদের ভূয়া চিকিৎসায় প্রতিনিয়ত বেড়ে ই চলছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। তার সাথে সাথে বেড়েছে মৃত্যুর হারও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন ২০১৬ এর অনুসারে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী,

দেশে মান সম্মত চিকিৎসা পাচ্ছেন মাত্র ১৮% মানুষ। চিকিৎসা সেবা নিতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ৭% মানুষ। সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ৭৫% মানুষ। স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও ধনী-দরিদ্র এবং গ্রাম-শহরের মধ্যে রয়েছে অনেক পার্থক্য।

বড় বড় ডিগ্রিধারী ডাক্তার উচ্চ ডিগ্রি লাভ করে সফল চিকিৎসক হলেও, দেশের অধিকাংশ চিকিৎসক ই ভূয়া সনদ ব্যবহার করে করছেন ডাক্তারি। ভূয়া উচ্চ ডিগ্রিধারী ডাক্তার চিকিৎসা সম্পর্কে কিছুটা জানলেও, একেবারে ভূয়া ও কম শিক্ষিত ডাক্তার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গ্রাম অঞ্চলে।

গ্রাম অঞ্চলের এমন ভূয়া ও অশিক্ষিত ডাক্তারদের খোঁজে দৈনিক ভোলা নিউজের সাংবাদিক মো. আকতারুল ইসলাম আকাশের তিন দিনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেড়িয়ে এসেছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশা, পূর্ব ইলিশা, বাপ্তা ও রাজাপুর ইউনিয়ন সহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বাজারে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পাওয়া গেছে এমন কিছু ভূয়া ডাক্তারদের ঠিকানা।

অনুসন্ধানের প্রথমে খোঁজ মেলে রাজাপুর ইউনিয়নের দাইয়া বাজারের পঞ্চম শ্রেণী পাস করা হাতুড়ে ডাক্তার পল্লী চিকিৎসক মো. শামীমের। দাইয়া বাজারে সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে দোকান বন্ধ করে পালিয়ে যান তিনি। ভূয়া ঐ ডাক্তারের ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে একাধিকবার ফোন করেও তা রিসিভ করেননি তিনি। কিভাবে তিনি ডাক্তার হয়েছেন? কি পাস করে ডাক্তার হয়েছেন? কি তার যোগ্যতা? এমন প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই ফাঁস করলেন তার যোগ্যতা ও ভূয়া ডাক্তারির কুকর্মের কথা।

গোপন সংবাদে জানা যায়, স্থানীয় নামিদামি বাজার জনতা বাজারের সালাম মেডিকেল হলের নামধারী ডাক্তার মো. জসিম ডাক্তার ই শামীমকে ডাক্তারি বানানোর মূল হোতা হিসেবে কাজ করেছেন। জসিম নামে এই ডাক্তার কিভাবে শামীমকে ডাক্তার বানিয়েছেন এবং কি তার (শামীমের) যোগ্যতা তা ফাঁস করে দিলেন শামীমের গুরু নামধারী ডাক্তার জসিম উদ্দিন।

নামধারী ওই জসিম ডাক্তার বলেন, শামীম ক্লাস পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্তু পড়াশোনা করে ঢাকায় চলে যায়। ঢাকায় গিয়ে তার এক আত্মীয়ের একটা গার্মেন্টসে গার্মেন্টসকর্মী হিসেবে কিছু বছর কাজ করেছেন। পরে সে গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছে। গ্রামে আসার পর তার বাবা আমাকে বলেছিলো তাকে ডাক্তারি শিখাইতে। সে মাস সাতেক আমার কাছে ডাক্তারি শিখেছে৷ পরে সে নিজেই বলেছে তার ডাক্তারি শিখা হয়ে গেছে, সে এখন একটা ডাক্তারি দোকান দিবে। এই কথা বলে সে আমার দোকান থেকে চলে গিয়ে ডাক্তারি দোকান দিয়েছে। এখন সে ডাক্তার। আপনার কাছে সে কি শিখছে? আপনার কাছে যা শিখছে তাতে কি সে ডাক্তার হয়ে গেছে? এই প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বুঝেন না ভাই গ্রামের ডাক্তারের আর কি বা যোগ্যতা লাগে। যেটুকু হয়েছে চলার মতো তো হবে। শুনেছি আপনি জসিম ডাক্তারও কম শিক্ষিত এবং আপনার ডাক্তারি করার কোন যোগ্যতা নেই এটা কি সত্যিই? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারেননি তিনি। এসময় তাকে বিভিন্ন ঔষধের নাম ও ঔষধের ডোজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেও কোন উত্তর দিতে পারেননি তিনি। তিনি নিজেই শিকার করলেন তার ডাক্তারি করার যোগ্যতা নেই। তবে সবাই করে তাই তিনিও ডাক্তারি করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এইখানে ই শেষ নয়, দাইয়া বাজারের শাহাবুদ্দীন, জনতা বাজারের বিউটি মেডিকেল হল, রৌদ্রের হাট বাজারের বিসমিল্লাহির মেডিকেল হল, হাওলাদার বাজারের নামধারী ডাক্তার কামাল, শান্তির হাট বাজারের ডাক্তার মোতালেব, ক্লোজার বাজারের আনোয়ার মেডিকেল ক্লিনিক, পরাণগঞ্জ বাজারের আলাউদ্দিন ডাক্তার, জংশন বাজারের ডাক্তার নরেশ, শাহীন ও বাশার। এইসব ডাক্তারদের নেই কোন যোগ্যতা, নেই কোন শিক্ষা, এইসমস্ত ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসায় ই বছরের পর বছর চলতে থাকে মৃত্যুর মিছিল, তার সাথে সাথে স্বাস্থ্যঝুঁকি তো আছেই

এসমস্ত অযোগ্য, অশিক্ষিত হাতুড়ে ডাক্তারদের বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডঃ রথিন্দ্র নাথ বলেন, পল্লী চিকিৎসক যাঁরা ১ বছর প্রশিক্ষন দিয়েছে। সেটা বৈধ। তাঁরা প্র্যাকটিস করতে পারবে তবে তা লিমিটেড হতে হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারবে। বাকি যাঁরা সনদ নিয়ে চিকিৎসা করবে, ওটা অবৈধ ভূয়া। ওটা হলো রিফ্রেশার ট্রিনিং লাইফ হেয়ার বলেনটিয়ার। তাঁরা কাউকে চিকিৎসা দিতে পারবে না। তাঁরা মানুষকে বিভিন্ন পরামর্শ দিতে পারবে। তাঁরা ডাঃ লিখতে পারবে না। অনেকেই আমাকে রিফ্রেশার ট্রেনিং করে সনদ সার্টিফিকেট নিতে চেয়েছে। কিন্তু আমি দেয়নি। অনেক সময় মন্ত্রীদের দিয়েও ফোন দিতো, কিন্তু আমি দিতাম না। কারণ ওটা ভূয়া। আর যাঁরা অল্প শিক্ষিত হয়ে চিকিৎসা করছে, নিজেকে ডাঃ পরিচয় দিচ্ছে তাঁরা ভূয়া। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।